সান্ত্বনা

শাহানাজ জাহান পুশন

প্রিয় বাবু, তোমার কি মনে আছে,এমন একটাও দিন ছিল না যেদিন সারাদিন কি কি ঘটেছে তা তোমাকে না বলা পর্যন্ত আমার শান্তি ছিল না?দিনশেষে আমার সংসার আর অফিসএর যত কাঁদুনি, রাগ, অভিমান শোনার পর তোমার সেই চিরচেনা মিষ্টি হাসি আর সেই ভালবাসার ‘সান্ত্বনা’?

“মন খারাপ করো না জান!কে কি বলে বা করে,তাতে কি বাবু? আমি আছি না?তোমার ভাল লাগে না এমন কিছু তোমাকে কক্ষনও করতে হবে না।তোমার যা ভাল লাগে তাই করবে।দুনিয়ার কোনও কুৎসিত জিনিসকে স্পর্শ করতে দেব না আমার লক্ষ্মী বউ কে!”হুম!….

শুধু তুমি যেদিন মারা গেলে,ঐদিনের কথাগুলি তোমাকে বলা হল না।সব কুৎসিত জিনিস প্রায় একদিনেই আমাকে স্পর্শ করল!শুনলে তোমার মন খারাপ হবে।

সেদিন অফিস ছিল তো, তাই অফিস এর ইউনিফর্ম – সার্ট, প্যান্ট পরা ছিলাম।তুমিতো আর আমাকে বলে মারা যাওনি, যে কাঁদার জন্য উপযোগি জামা-কাপড়পরে থাকব!হাসবে না, আমি মোটেও ঠাট্টা করছি না,…তোমার জন্য যখন আমি এলিয়ে কাঁদছি, তখন শুনলাম লোকে বলাবলি করছে,

“এই মেয়েই কি বউ!একি কেমন মেয়ে সার্ট, প্যান্ট পরা কেন…অ…আচ্ছা আচ্ছা চাকরি করে বুঝি?তাহলে তো রক্ষা, কিন্তু বেচারি অমন করে বেখেয়াল কাঁদছে, লোকে কি বলবে! এই কে আছ ওকে একটা ওড়না পরিয়ে দাও!”আর কোন একজন ভাবী সত্যি সত্যি বড় একটা ওড়না দিয়ে আমার মাথা পেঁচিয়ে দিয়ে গেল! খুব দমবন্ধ লাগছিল,অন্ধকার লাগছিল ওড়নার ভেতরটা।তুমি জান তুমি বেঁচে থাকলে কক্ষনো এমন অন্যায় মেনে নিতাম না, কিন্তু বাবু…তুমি তো নেই!আমার…আমার খুব দুর্বল লাগছিলো আর ভয় হচ্ছিল।মনে হচ্ছেলো গোটা দুনিয়া হা হা করে আমাকে দেখে নিষ্ঠুর ভাবে হাসছে আর বলছে ‘বাছাধন,এতদিন জামাই এর আস্পর্ধাতে তো খুব লাফালাফি করেছ!এইবার দেখ তোমাকে কি ভাবে সায়েস্তা করি!শুরু হল ওই সাদাকালো ওড়না টা দিয়ে।

আমার অদ্ভুত,ক্লান্তিকর, হাস্যকর, বিরক্তিকর, সান্ত্বনা আর ‘স্পেসাল কেয়ার পর্ব (!) শুরু হল।আমি যখন সোজা বাড়ি ফিরে আল্লাহ্‌র কাছে দুহাত তুলেছি আর কেঁদে কেঁদে তার কাছে জবাব চাইছি কেন তোমাকে সে নিয়ে গেল তখন বড় আপা দরজাটা লাগিয়ে দিল।কিন্তু অপেক্ষমাণ জনতার ভিড় কে ঠ্যাকায় বল?

যে মরেছে তার বউ কই? অ…অ্যাঁই বুঝি বউ। সেকি বউ কাঁদে না এ কেমন কথা রে বাবা! এমন মরাবাড়ি তো কোনোদিন দেখিনি!অ…নামাজে বসেছে বুঝি? বাহ বাহ মেয়ে ত খুব শক্ত!কিন্তু এই বে- ওয়াক্তে নামাজ!…তা আমাদের সাথে একটু কথা টথা বলুক!না হলে মেয়েটা তো ইজি হতে পারবে না!আমরা এত দূর দুরান্ত থেকে সান্ত্বনা দিতে এসেছি একটু কথা টথা বলে যাই!

আমি উঠতে চাইনি,কিন্তু আবার ভয় পেলাম। আপা বলল একটু কথা বল ওদের সাথে, সারাক্ষণ নামাজে বসে থাকলে লোকে দেখা করবে কিভাবে? হঠাৎ হাসি পেল।ভাবলাম আমার চেয়েও ওরা তো বেশি দুখি। মরাবাড়ি এসে কোন মজাই পাচ্ছে না।বউ কেঁদে গড়িয়ে বিছানা থেকে পড়ছে না,বিলাপ নেই,আফসোস নেই, অন্যের দুঃখ দেখার আর সেই দুঃখে জ্বালা ধরানো ‘সান্ত্বনা’ বানী দেবার যে বিরাট আনন্দ তা পাছে না,আসলেই কি অন্যায় বলতো!

সুতরাং চোখ মুছে হাসিমুখে বিছানায়ে গিয়ে বসলাম। আমার অফিসিয়াল সান্ত্বনা পর্ব শুরু হল।

প্রথম সান্তনাদাতাঃ (কিছুক্ষণ ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না)“সুমন আমাদের যে পরানের ধন ছিল তা আর কি বলব মা! অর মরার কথা শুইনা কালকে অর মা আর কি কানসে আমরা কানসি তার চেয়ে বেশি!”

আমিঃ (হাসিমুখে)“বলেন কি!মার চেয়েও আপনাদের কষ্ট বেশি! কি দুঃখের কথা! বেশি যখন কেঁদেছেন,হুম কষ্ট নিশ্চয় মার চেয়ে বেশি পেয়েছেন! কোন সন্দেহ নাই!”

দ্বিতীয়সান্তনাদাতাঃ “তা মা তুমার কষ্ট ত চক্ষে দেখা যায় না । (হঠাৎ ফিসফিস করে) সরকার থেকে টাকা পয়সা কিছু পাইবা? কত পাইবা মা?”

(আমি হতভম্ব। টাকা! এটা ত মাথায় আসেনি!সাবাস বাঙালি,তোমার জয় হক! মরাবাড়িতে যাদের মাথায় আগে টাকা আসে তাদের উন্নতি কে ঠ্যাকায়!)

তৃতীয় সান্তনাদাতাঃ(উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে) কিভাবে মারা গেল বল ত মা! তোমার চাচা তখন টিভি দেখতেসিল। হঠাৎ আমাকে বলে…(কেমন করে তোমার মৃত্যু সংবাদ পেল তার বিতং বর্ণনা…)

যেই আসে;

“কেমন করে মারা গেল?”

“কিভাবে মারা গেল?”

“কি হয়েছিল আবার একটু বল ত মা!তুমি তখন কই ছিলা? কি করতেছিলা?”

কেন যে ফাইটার প্লেন ক্র্যাশকরে মারা গেলে! নিজেকে তো তোমার বউ না, নিউজপেপার মনে হচ্ছিল।সবাই খবরের জন্য আসে।একসময় বাধ্যও হয়ে বললাম ‘কষ্ট করে নিউজ পেপারটা পড়ে নিয়েন।আমাকে একটু মাফ করে দিবেন দয়া করে।খুব মাথা ধরেছিল।

রাতে বড় আপাকে বললাম,“আপা প্লীজ আমাকে এখান থেকে চুপি চুপি তোমার বাসায়ে নিয়ে যাও।”

আপা বলল “নিতাম আপুনি,কিন্তু সবাই কি বলবে! জামাই মারা যাবার দিন শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে গেলে মন্দ কথা বলবে!আজকের রাতটা থাক,দেখি কালকে কিছু করা যায় নাকি!”

শিলাপুর কষ্ট দেখছিলাম। বেচারি! ভাই মারা যাবার দুঃখ করবে কখন,সবার খাবার আর বিছানার বন্দোবস্ত করতেই প্রাণ যায়। একবার মনে হল যাই,তাকে সাহায্য করি,রান্না চরাই।

হঠাৎ মনে পড়ল এখানে তো তোমার বিছানা,যেখানে দুরাত আগেও তুমি শুয়েছ, বেডশিটে এখনও তোমার গায়ের গন্ধ লেগে আছে,আজ রাতে এখানেই তাহলে ঘুমাই।হয়ত এই নির্বোধ মানুষদের কাছ থেকে রাতটুকু রেহাই পেয়ে তোমাকে অনুভব করব, স্বপ্নে আসবে তুমি একটিবার,শেষবার!

সদ্য বিধবা বউকে একা রাতে শুতে দিতে নেই,এই ওজুহাতে চারজন মোটা মোটা,অপিরিচিতা আত্মীয়া সারারাত সেই বিছানা দখল করে ঘুমাল।গভীর রাতে আমি একা একা ঘুম ভেঙ্গে সেই শীতের রাতে বারান্দায় জেগে বসে রইলাম।

জানি,তুমি অনেক দুঃখ পাচ্ছ আমার কথা শুনে। তবে কি কেউ আমাকে সান্ত্বনা দিতে পারে নি?

পেরেছে,আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধুরা যখন আমার হাত ধরে নিঃশব্দে দাড়িয়ে ছিল,তখন পেরেছে,মা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে “তুমি আমার সুমন” বলে ডুকরে কেঁদেছে…তখন পেরেছে।

আর পেরেছে সেই ভিখারি মহিলাটি। তোমাকে যখন ওরা কবর দিচ্ছিল তখন গোরস্থানের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল।চোখের পানি মুছতে মুছতে কাছে এসে বলেছিল, “তুমি বাইচা থাক মা,তুমি সুন্দর কইরা বাইচা থাকলে হে বাইচা থাকব!”

ওর কথা শুনে খুব চিৎকার করে কিছুক্ষণ কেঁদেছিলাম!

Advertisements

19 thoughts on “সান্ত্বনা

  1. এত অসাধারণ করে নিজের অনুভূতি লিখার ক্ষমতা আর কারো আছে কিনা জানা নেই। মনে হচ্ছে সব ঘটনা চোখের সামনে ঘটেছে। সেই দিনগুলোতে তোর পাশে না থাকতে পারার অপরাধ বোধ থেকে তোর পা ধরে মাফ চাইতে মন চাচ্ছে। আমি তোর সেই “আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধুরা” এর একজন হয়েও তোর হাত ধরে নিঃশব্দে দাড়িয়ে থাকতে পারিনি বলে নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে। পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস।

  2. জন্ম মৃত্যু ঘিরে আমাদের বাঙালি সমাজের সামাজিকতাগুলোকে আমার জঘন্য মনে হয়। হয়তো সব সমাজেই এমন জঘন্য সামাজিকতা আছে, কিন্তু আমি কেবল বাঙালিদেরটা দেখেছি বলে বলতে পারি। একজন মানুষ মারা গেছেন, তাকে ঘিরে তার আপনজনের শোক (সেটা প্রকাশ্য বা গোপন যেমনই হোক না কেন) পালনের ব্যাপারটা প্রথা হবে কেন? সেটা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কিন্তু এই সমাজে হাউমাউ করেই কাঁদতে হবে, লোকজন দেখিয়ে বিলাপ করতে হবে, আহাজারি করতে হবে। এই উৎকট প্রদর্শনীর কোনো মানে হয় না! আমার আপন কেউ মারা গেলে আমি কী করবো জানি না, হয়তো সবাইকে ভাগিয়ে দিয়ে একা একা বসে থাকবো, তাতে যদি ঠুনকো সামাজিক সম্পর্ক ভেঙেও যায়, কিছু আসে যায় না। যারা সমব্যথী, যারা আপন, তারা ঠিকই বুঝে যাবে আমার অবস্থা!

    লেখাটার অকপট ভঙ্গি খুব ভাল লাগলো।

    • ধরুন আমি মারা গেলাম, আশরাফ বেঁচে থাকল, সেক্ষেত্রেও কি সামাজিকতা টা একই থাকবে? সামাজিকতার দোষ টা ঠিক কোথায় আসুন সেটা বের করি!

  3. khala.. kono din tomake hoyto bujhaye bolte pari nai je ami tomake koto ta pochondo kori.. shobar kache boli tomar kotha.. u r the strongest and most determined woman I’ve ever ever seen.. Ammu r nanu ke lekha ta poralam.. Chokh bhorti pani niye nanu bollo..’tor nana mara gesilen 1968 e.. Ashraf mara gelo 2010 e…tokhon amake joto ottachar shojjho korte hoise.. Pushon keo shojjho korte hoise…Shei bhoyabohotar bindumatro poriborton hoyni ei jug e esheo’..
    shudhu oi mohilar moto kore tomake bolte chai khala..”
    “তুমি বাইচা থাক মা,তুমি সুন্দর কইরা বাইচা থাকলে হে বাইচা থাকব!”

    • লেখিকা তোমার খালা হন জেনে ভাল লাগল। আল্লাহ যেন উনাকে সুন্দর করে বেঁচে থাকতে দেন…দুনিয়ার কোনও কুৎসিত জিনিস যেন উনাকে আর স্পর্শ না করে উনার জন্য সেই দোয়া করছি। সাথে এই প্রার্থনা করছি আমি মরে গেলে আমার স্ত্রীকে যেন কেউ এভাবে কষ্ট না দেয়।

    • প্রজ্ঞা, তোমরা আছ বলেই ত জীবন কে এখনও ভালোবাসি, বিশ্বাস করি। তুমি, বুশরা, প্রমা, ফারিয়া আমার লক্ষ্মী খালামনিরা,
      আমরা একদিন সব বদলে দেব, ঠিক না?

  4. Amra shob shomoy tor pashe chilam achi abong thakbo,ai shob tothakothito shantona deyar jonno noy borong aro shokto hoye beche thakar jonno.

  5. Some aspects of this remind me of my mother’s experience when my grandmother passed away. Yet another example of how our societal norms can make a tragic situation worse.

  6. ey ekta diner kotha ami sharajiboneo vulbona…hotath shedin upolobdhi korechilam j amader jibonta koto onishchit…r mrittu k niye amader deshe ba duniyar shobkhanei hoyto j prohoshon chole shetao chironton…Tolstoy er bikhato uponnash The death of Ivan Ilyich e bodhoy shobcheye valovabe ey baparta uthe ashche…Anyways, nije shokto thakish shobshomoy…shob thik thakbe…

    • তোকে দেখে এখন খুব ভাল লাগে সারা। আমি জানতাম তুই একসময় সব কাটিয়ে উঠে এইরকম শক্তিমান একটা মেয়ে হবি! এই ব্লগ টাতে লিখিস না কেন?

  7. দু’পারের দুই ভালবাসার মানুষ দুটি ভাল থাকুক!!!

  8. আল্লাহকে খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে কেন তিনি আপনার সাথে এমন করলেন। যাহোক, আল্লাহ যেন আপনাকে সুন্দর করে বেঁচে থাকতে দেন…এরপর দুনিয়ার আর কোন কুৎসিত জিনিস যেন আপনাকে স্পর্শ না করে সেই দোয়া করছি। সাথে এই প্রার্থনা করছি আমি মরে গেলে আমার স্ত্রীকে যেন কেউ এভাবে কষ্ট না দেয়। আপনার লেখা পরে মনে হচ্ছে আমার এখুনি একটি উইল করে রাখা উচিৎ; যাতে লেখা থাকবে আমি মরে গেলে আমার ইচ্ছা হবে আমার স্ত্রীর প্রতি এরকম আচরন যেন কেউ না করে।

    • ধন্যবাদ এলাহি,আপনার সুন্দর শুভকামনার জন্য।আমি এর পর একজনের কথা শুনলাম,যার স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, টেনে টেনে তার আত্মীয়রা তার গায়ের সব গয়না খুলে ফেলে,তার কানের দু গলার চেইন, আংটি… যাতে অই বিধবা কে দেখে কোন পুরুষ আকৃষ্ট না হয়। আশরাফ এরও নিশ্চয় ইচ্ছা ছিল কেউ যেন আমার সাথে এমন আচরণ না করে! কে শুনল তার কথা!
      সম্পত্তির উইল হয়। ভাল আচরনের হয় না।তাই মনে হয় ভাল হবে আপনার আত্মীয়দের এবং বন্ধুদের সচেতন করা যাতে এই অদ্ভুত কালচার বদলায়।

  9. pushon…I just pray for u.u r a real soldier….u can live.”
    দু’পারের দুই ভালবাসার মানুষ দুটি ভাল থাকুক!!!”

  10. ভালোবাসার মানুষ মরে গেলে, দায়ী করে যায়। মৃত্যু!! সেও বুঝি সৌভাগ্যবানদের ভাগ্যে জোটে, সমাজ প্রহসন, ইউরোপে মানুষ মরে গেছে ভাড়া করা মানুষ কাঁদে।
    জীবন একটাই। তুমি ভালো ভাবে বাঁচো!!!! সুভ কামনা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s